Skip to main content

পর্ব –১৩ : আশ্রমের সকাল

পর্ব – ৩ : আশ্রমের সকাল

পরদিন ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল অরিন্দমের।

হোটেলের জানালা খুলতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আভা ফুটতে শুরু করেছে।

সুব্রত তখনও ঘুমিয়ে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।

সকালের তারাপীঠ যেন রাতের তারাপীঠ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভিড় এখনও জমেনি। রাস্তার দু'পাশে কয়েকজন ভক্ত, হাতে ফুল-বেলপাতা। কোথাও শঙ্খধ্বনি, কোথাও মন্দিরের ঘণ্টার মৃদু শব্দ।

হাঁটতে হাঁটতে সে মূল রাস্তা ছেড়ে একটু ভেতরের দিকে চলে গেল।

একটা পুরনো বটগাছের ছায়ায় ছোট্ট একটা আশ্রম।

না, জাঁকজমক কিছু নেই। মাটির উঠোন, একপাশে তুলসীমঞ্চ, আর সামনেই মা তারার একটি ছোট মন্দির।

বারান্দায় বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী।

গেরুয়া বসন, শুভ্র দাড়ি, আর আশ্চর্য রকমের শান্ত দুটি চোখ।

অরিন্দম নমস্কার করতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন—

— "কলকাতা থেকে এসেছ?"

অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।

— "কী করে বুঝলেন?"

সন্ন্যাসী হেসে বললেন—

— "এখানে যারা আসে, তাদের পায়ের ধুলো আলাদা হতে পারে, কিন্তু চোখের ভাষা খুব একটা আলাদা হয় না।"

অরিন্দম বারান্দার এক কোণে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ।

তারপর সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন—

— "মায়ের কাছে কী চাইতে এসেছ?"

প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম থমকে গেল।

সত্যিই তো, সে কী চাইতে এসেছে?

অনেকক্ষণ ভেবে বলল—

— "জানি না।"

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

— "এই উত্তরটাই সবচেয়ে সত্যি।"

একটু দূরে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন—

— "এই তারাপীঠে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। কেউ অর্থ চায়, কেউ সাফল্য, কেউ সুস্থতা। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, তার আসল অভাবটা কোথায়।"

বাতাসে বটগাছের পাতা নড়ে উঠল।

সন্ন্যাসী বললেন—

— "বামাক্ষ্যাপার কথা নিশ্চয়ই জানো?"

— "হ্যাঁ, কিছুটা।"

— "লোকের চোখে তিনি ছিলেন খ্যাপা। কিন্তু তিনি জানতেন তিনি কী চান। তাই মা-কে পেয়েছিলেন। আর আমরা? সারাজীবন কী চাই তা-ই ঠিক করে উঠতে পারি না।"

অরিন্দম চুপ করে শুনছিল।

সন্ন্যাসী আবার বললেন—

— "উপনিষদে একটা কথা আছে— 'পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদম্'। এই জগৎ পূর্ণ, মানুষও পূর্ণ। অথচ আমরা সারাজীবন নিজেদের অপূর্ণ ভেবে কাটিয়ে দিই।"

— "কিন্তু মানুষের জীবনে তো অপূর্ণতা থাকেই।"

সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললেন—

— "অপূর্ণতা থাকে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মানুষ নিজের ভেতরের শূন্যতাকে বাইরের জিনিস দিয়ে ভরতে চায়।"

একটু থেমে আবার বললেন—

— "অর্থ দরকার। সম্মান দরকার। সাফল্যও দরকার। কিন্তু এগুলো জীবনের গন্তব্য নয়, পথ চলার উপকরণ মাত্র।"

অরিন্দমের মনে পড়ে গেল নিজের জীবনটা।

বহু বছরের পরিশ্রম, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা...

তবু কোথাও যেন একটা শূন্যতা।

হয়তো সেই কারণেই সে আজ এখানে।

সন্ন্যাসী এবার গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন।

— "তোমার চোখে দ্বন্দ্ব দেখছি।"

অরিন্দম একটু চমকে উঠল।

— "দ্বন্দ্ব?"

— "হ্যাঁ। মন যখন দুই দিকে টানে, তখন চোখের ভেতর একটা অস্থিরতা জন্মায়।"

অরিন্দম কোনো উত্তর দিল না।

সন্ন্যাসী নিজেই বললেন—

— "মনে রেখো, জীবনের বড় সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নেওয়া যায় না। আবার শুধু আবেগ দিয়েও নয়।"

— "তাহলে?"

সন্ন্যাসীর ঠোঁটে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।

— "যেখানে শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে, আর নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা আছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত সেখানেই আশ্রয় খোঁজে।"

কথাগুলো বলে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

মন্দিরের দিকে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকালেন।

— "আর একটা কথা।"

অরিন্দম তাকাল।

— "জীবনসঙ্গী খোঁজার আগে মানুষকে নিজের সঙ্গী হতে শিখতে হয়।"

সন্ন্যাসী চলে গেলেন।

অরিন্দম অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

সকালের আলো তখন আশ্রমের উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তাকে কোনো উত্তর দেননি।

শুধু এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো থেকে এতদিন সে নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।

দূরে তখন মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

আজ তারা মায়ের পূজা দেবে।

কিন্তু তারও আগে, হয়তো নিজের মনের সামনে একবার মাথা নত করা দরকার।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...