কিছুদিন আগে এক পশু চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। খুব ভদ্রভাবেই বললাম,
— "দাদা, একটু দেখবেন?"
আমার কথা শেষ হতে না হতেই পরিবেশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। মনে হলো, আমি যেন তাঁকে ডাক্তার নয়, সরাসরি গরু-ছাগলের রাখাল বলে ফেলেছি!
তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,
— "দাদা মানে? আমি একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার।"
আমি তৎক্ষণাৎ বুঝলাম, রোগটা গরুর নয়, সম্বোধনের।
সঙ্গে সঙ্গে ভুল সংশোধন করলাম—
— "ওহ, স্যার, একটু দেখবেন?"
অলৌকিক ঘটনা! মুহূর্তের মধ্যে মুখের মেঘ কেটে গেল। কণ্ঠস্বর নরম হলো, চেয়ার এগিয়ে দিলেন, এমনকি হাসিও দিলেন।
সেদিন বাড়ি ফিরে একটা বড় শিক্ষা পেলাম। আমাদের দেশে ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জন করা যত কঠিন, "স্যার" সম্বোধন ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।
তারপর থেকে আমি বিষয়টা নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম।
প্রথম পরীক্ষাটা করলাম ব্যাংকে।
— "দাদা, একটা ফর্ম দেবেন?"
তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ঋণ নয়, সরাসরি একটা কিডনি চাইছি।
পরে "স্যার" বলার পর বুঝলাম, কিডনি নয়, ফর্মটাই চেয়েছিলাম।
পরের দিন আবার গেলাম।
— "স্যার, একটা ফর্ম দেবেন?"
তিনি বললেন,
— "আসুন স্যার, বসুন স্যার।"
আমি ভাবলাম, ফর্মটা কি একই? নাকি "স্যার" বলার পর বিশেষ সংস্করণ পাওয়া যায়?
এরপর চায়ের দোকানে পরীক্ষা করলাম।
— "দাদা, এক কাপ চা।"
চা এল যখন, ততক্ষণে আমার চায়ের ইচ্ছেটাই প্রায় চলে গেছে।
পরদিন বললাম,
— "স্যার, এক কাপ চা দেবেন?"
চা আসতে এত কম সময় লাগল যে সন্দেহ হলো, চা আগে থেকেই তৈরি ছিল।
এখন আমি নতুন নিয়ম করেছি। আগে মানুষকে দেখে পেশা বোঝার চেষ্টা করতাম। এখন আর করি না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সবাইকে "স্যার" বলি।
মুদিওয়ালা স্যার।
মাছওয়ালা স্যার।
অটোওয়ালা স্যার।
বিদ্যুৎ অফিসের কেরানি স্যার।
এমনকি একদিন ভুল করে পাড়ার পাঁচ বছরের এক বাচ্চাকেও বলেছিলাম,
— "স্যার, একটু সরে দাঁড়াবেন?"
ছেলেটা এতটাই খুশি হয়েছিল যে সারা পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছে।
— "আজ আমাকে স্যার বলেছে!"
সেদিন বুঝলাম, "স্যার" শুধু সম্বোধন নয়, এটা এক ধরনের মানসিক পুষ্টিকর খাদ্য।
তবে আমার সবচেয়ে বড় ভয় এখন অন্য জায়গায়।
যদি কোনোদিন কাউকে "স্যার" না বলে ফেলি!
কারণ অভিজ্ঞতা বলছে, এ দেশে অনেক ভুল ক্ষমা পাওয়া যায়। বিদ্যুতের বিল বাকি থাকলেও চলে, কিস্তি মিস হলেও চলে, অফিসে দেরি হলেও চলে।
কিন্তু একজন সম্ভাব্য স্যারকে যদি ভুল করে "দাদা" বলে ফেলেন, তাহলে আপনার সামাজিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
তাই এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস—
বাংলা ভাষার সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ "মা" নয়, "ভালোবাসা" নয়, বরং "স্যার"।
কারণ "মা" সবাইকে খুশি করতে পারে না, "ভালোবাসা" সবাইকে জিততে পারে না, কিন্তু যথাসময়ে উচ্চারিত একটি "স্যার" অনেক অসম্ভব কাজ সম্ভব করে দিতে পারে।
তাই সরকারের কাছে আমার বিনীত প্রস্তাব, ভবিষ্যতে ভোটার তালিকা বা জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের আগে "শ্রী", "মোঃ", "মিস" এসব না লিখে সরাসরি "স্যার" লিখে দেওয়া হোক।
তাহলে আর কাউকে ভুল করে "দাদা" বলে সামাজিক অপরাধ করার ভয় থাকবে না।
ভাবুন তো, কী সুন্দর দেখাবে—
স্যার হরিপদ মণ্ডল
স্যার গোপাল চক্রবর্তী
স্যার রহিম শেখ
এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানে ডাকও শোনা যাবে—
— "এই যে স্যার, এক কাপ চা খাবেন স্যার?"
— "না স্যার, আজ আর চা নয় স্যার!"
তখন সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
কারণ এ দেশের সবাই সমান না হলেও, অন্তত সবাই "স্যার" হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার পাবে!

Comments
Post a Comment