Skip to main content

স্যারতত্ত্ব😀😜


কিছুদিন আগে এক পশু চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। খুব ভদ্রভাবেই বললাম,

— "দাদা, একটু দেখবেন?"

আমার কথা শেষ হতে না হতেই পরিবেশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। মনে হলো, আমি যেন তাঁকে ডাক্তার নয়, সরাসরি গরু-ছাগলের রাখাল বলে ফেলেছি!

তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,

— "দাদা মানে? আমি একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার।"

আমি তৎক্ষণাৎ বুঝলাম, রোগটা গরুর নয়, সম্বোধনের।

সঙ্গে সঙ্গে ভুল সংশোধন করলাম—

— "ওহ, স্যার, একটু দেখবেন?"

অলৌকিক ঘটনা! মুহূর্তের মধ্যে মুখের মেঘ কেটে গেল। কণ্ঠস্বর নরম হলো, চেয়ার এগিয়ে দিলেন, এমনকি হাসিও দিলেন।

সেদিন বাড়ি ফিরে একটা বড় শিক্ষা পেলাম। আমাদের দেশে ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জন করা যত কঠিন, "স্যার" সম্বোধন ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।

তারপর থেকে আমি বিষয়টা নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম।

প্রথম পরীক্ষাটা করলাম ব্যাংকে।

— "দাদা, একটা ফর্ম দেবেন?"

তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ঋণ নয়, সরাসরি একটা কিডনি চাইছি।

পরে "স্যার" বলার পর বুঝলাম, কিডনি নয়, ফর্মটাই চেয়েছিলাম।

পরের দিন আবার গেলাম।

— "স্যার, একটা ফর্ম দেবেন?"

তিনি বললেন,

— "আসুন স্যার, বসুন স্যার।"

আমি ভাবলাম, ফর্মটা কি একই? নাকি "স্যার" বলার পর বিশেষ সংস্করণ পাওয়া যায়?

এরপর চায়ের দোকানে পরীক্ষা করলাম।

— "দাদা, এক কাপ চা।"

চা এল যখন, ততক্ষণে আমার চায়ের ইচ্ছেটাই প্রায় চলে গেছে।

পরদিন বললাম,

— "স্যার, এক কাপ চা দেবেন?"

চা আসতে এত কম সময় লাগল যে সন্দেহ হলো, চা আগে থেকেই তৈরি ছিল।

এখন আমি নতুন নিয়ম করেছি। আগে মানুষকে দেখে পেশা বোঝার চেষ্টা করতাম। এখন আর করি না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সবাইকে "স্যার" বলি।

মুদিওয়ালা স্যার।

মাছওয়ালা স্যার।

অটোওয়ালা স্যার।

বিদ্যুৎ অফিসের কেরানি স্যার।

এমনকি একদিন ভুল করে পাড়ার পাঁচ বছরের এক বাচ্চাকেও বলেছিলাম,

— "স্যার, একটু সরে দাঁড়াবেন?"

ছেলেটা এতটাই খুশি হয়েছিল যে সারা পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছে।

— "আজ আমাকে স্যার বলেছে!"

সেদিন বুঝলাম, "স্যার" শুধু সম্বোধন নয়, এটা এক ধরনের মানসিক পুষ্টিকর খাদ্য।

তবে আমার সবচেয়ে বড় ভয় এখন অন্য জায়গায়।

যদি কোনোদিন কাউকে "স্যার" না বলে ফেলি!

কারণ অভিজ্ঞতা বলছে, এ দেশে অনেক ভুল ক্ষমা পাওয়া যায়। বিদ্যুতের বিল বাকি থাকলেও চলে, কিস্তি মিস হলেও চলে, অফিসে দেরি হলেও চলে।

কিন্তু একজন সম্ভাব্য স্যারকে যদি ভুল করে "দাদা" বলে ফেলেন, তাহলে আপনার সামাজিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

তাই এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস—

বাংলা ভাষার সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ "মা" নয়, "ভালোবাসা" নয়, বরং "স্যার"।

কারণ "মা" সবাইকে খুশি করতে পারে না, "ভালোবাসা" সবাইকে জিততে পারে না, কিন্তু যথাসময়ে উচ্চারিত একটি "স্যার" অনেক অসম্ভব কাজ সম্ভব করে দিতে পারে।

তাই সরকারের কাছে আমার বিনীত প্রস্তাব, ভবিষ্যতে ভোটার তালিকা বা জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের আগে "শ্রী", "মোঃ", "মিস" এসব না লিখে সরাসরি "স্যার" লিখে দেওয়া হোক।

তাহলে আর কাউকে ভুল করে "দাদা" বলে সামাজিক অপরাধ করার ভয় থাকবে না।

ভাবুন তো, কী সুন্দর দেখাবে—

স্যার হরিপদ মণ্ডল

স্যার গোপাল চক্রবর্তী

স্যার রহিম শেখ

এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানে ডাকও শোনা যাবে—

— "এই যে স্যার, এক কাপ চা খাবেন স্যার?"

— "না স্যার, আজ আর চা নয় স্যার!"

তখন সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

কারণ এ দেশের সবাই সমান না হলেও, অন্তত সবাই "স্যার" হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার পাবে!

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...