Skip to main content


গাড়িটা তারাপীঠের দিকে যত এগোচ্ছিল, অরিন্দমের মনের ভেতর ততই একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছিল। জানালার বাইরে লাল মাটির রাস্তা, দুপাশে শাল-পিয়ালের সারি। সুব্রত পাশে বসে মাঝে মাঝে  কথা বলছে, কিন্তু অরিন্দমের কানে কথাগুলো ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছিল না।

তারাপীঠে পৌঁছে হোটেলে চেক-ইন করেই অরিন্দম প্রথমে স্নান সেরে নিল। সুব্রত বলল, "চল, মন্দিরে যাই। সন্ধ্যারতি দেখব।"  

অরিন্দম মাথা নাড়ল। কিন্তু পা দুটো যেন একটু ভারী লাগছিল।

মন্দির চত্বরে ঢুকতেই শঙ্খ-কাঁসরের শব্দ, ভক্তদের ভিড়, "জয় তারা মা" ধ্বনি—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অরিন্দম চোখ বুজল। প্রার্থনা করতে গিয়ে সে বুঝল, সে আসলে কী চাইছে তা নিজেই জানে না। পদোন্নতি? না। অর্থ? না।  

শুধু একটু শান্তি। একটু... ঘর।


পূজা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, সুব্রত ফোনে কথা বলছে। ফোন রাখতেই বলল, "জানিস, মামা ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছিল ঈশিতাকে কেমন লাগল।"


অরিন্দম হাসল। "কী বলব বল? "

 "মেয়েটি বুদ্ধিমতী। আর কিছু না?" সুব্রত চোখ টিপল।  

অরিন্দম উত্তর দিল না। আকাশের দিকে তাকাল। তারার মাঝে চাঁদটা আজ আবার উঠেছে। গোল, শান্ত, নির্লিপ্ত। ঠিক গতরাতের মতোই।

রাতে খাওয়ার পর দুজনে ছাদে গিয়ে বসল। শহরের কোলাহল নেই এখানে। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে শ্মশানের চিতার আলো।


সুব্রত হঠাৎ বলল, "আচ্ছা অরিন্দম, তোর কি মনে হয় না... জীবনের চল্লিশের পর প্রেম-ভালোবাসা একটু অন্যরকম হয়ে যায়?"  

"কেমন?"  

"টগবগে হয় না। বরং ধীর, স্থির। যেন দুজন বয়স্ক মানুষ এক কাপ চা নিয়ে বসেছে। কারও তাড়া নেই। শুধু পাশে থাকাটাই যথেষ্ট।"


অরিন্দম চুপ করে রইল। পকেট থেকে মোবাইল বের করল। স্ক্রিনে তখনও মেঘলার শেষ মেসেজটা ভাসছে—  

*"কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"*


আর তার ঠিক নিচেই ঈশিতার বাবার নাম্বার সেভ করা। মামা পাঠিয়েছিলেন।


দুটো নাম। দুটো পথ।  

একটা পথে অস্থিরতা আছে, প্রশ্ন আছে, অনিশ্চয়তা আছে।  

আরেকটা পথে শান্তি আছে, বোঝাপড়া আছে, সময় আছে।

অরিন্দম আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ছোটবেলায় সে চাঁদের সঙ্গে পথ চলত। এখন চাঁদটা ঠিকই আছে, কিন্তু সে নিজেই হারিয়ে গেছে ভিড়ের মধ্যে।

হঠাৎ মোবাইলটা আবার ভাইব্রেট করল। নতুন মেসেজ।  

নাম দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল— *মেঘলা*।


মেসেজটা ছোট:  

*"তারাপীঠে চাঁদটা কি আজও আপনার সঙ্গে পথ চলছে?"*


অরিন্দম অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘলা জানল কী করে সে তারাপীঠে? সৌমেন নিশ্চয়ই বলেছে।সৌমেন কে ফোনে বলেছিল তারাপীঠ যাবে।


সে আঙুল দিয়ে টাইপ করল, আবার মুছে দিল। কী উত্তর দেবে? "হ্যাঁ, চলছে"? নাকি "না, আমি হারিয়ে গেছি"?


শেষে শুধু লিখল—  

*"চাঁদটা আছে। আমি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি।"*


সেন্ড বাটন টিপতেই ওপার থেকে রিপ্লাই এল প্রায় সঙ্গে—  

*"খুঁজবেন না। থেমে যান। চাঁদ হারায় না, মানুষই চাঁদের নিচে দাঁড়াতে ভুলে যায়।"*


মেসেজটা পড়ে অরিন্দমের চোখ ভিজে এল কিনা বোঝা গেল না। শুধু বুঝল, বহুদিন পর কেউ তাকে থামতে বলল। দৌড়াতে না।


সুব্রত পাশ থেকে বলল, "কী রে? কার মেসেজ?"  

অরিন্দম মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে বলল, "কেউ না। পুরোনো একটা বন্ধু।"


আকাশের চাঁদটা তখন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। জ্যোৎস্না এসে পড়েছে ছাদের মেঝেতে।  

অরিন্দম চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে হোটেলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় এল।


রাতের তারাপীঠ শান্ত। দোকানপাট বন্ধ। শুধু মন্দিরের দিক থেকে ভেসে আসছে মায়ের নামগান।


সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। অনেক বছর পর সে চাঁদটাকে শুধু দেখল না।  

*দেখা হয়ে উঠল।*


আর মনে হলো—হয়তো জীবনের নতুন অধ্যায়টা শুরু করার জন্য খুব জোরে দৌড়াতে হয় না। মাঝে মাঝে শুধু থেমে, আকাশের দিকে তাকালেই হয়।


পকেটে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল।  

এবার মেসেজটা ঈশিতার বাবার কাছ থেকে—  

*"মেয়ে বলেছে, আপনাদের কথা ওর ভালো লেগেছে। আপনিও যদি রাজি থাকেন, আমরা সামনের মাসে দিন দেখতে চাই।"*


অরিন্দম মেসেজটা পড়ল। পড়ে রেখে দিল। উত্তর দিল না।


তার সামনে দুটো দরজা। একটা শান্তির, আরেকটা অস্থিরতার।  

কোন দরজাটা খুলবে সে, তা এখনও সে নিজেই জানে না।


শুধু জানে, আজ রাতে চাঁদটা আর নির্লিপ্ত লাগছে না।  

বরং মনে হচ্ছে, বহু বছর পর চাঁদটাও যেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।


পরদিন ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল অরিন্দমের।

হোটেলের জানালা খুলতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আভা ফুটতে শুরু করেছে।

সুব্রত তখনও ঘুমিয়ে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। 

সকালের তারাপীঠ যেন রাতের তারাপীঠ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভিড় এখনও জমেনি। রাস্তার দু'পাশে কয়েকজন ভক্ত, হাতে ফুল-বেলপাতা। কোথাও শঙ্খধ্বনি, কোথাও মন্দিরের ঘণ্টার মৃদু শব্দ।

হাঁটতে হাঁটতে সে মূল রাস্তা ছেড়ে একটু ভেতরের দিকে চলে গেল।

একটা পুরনো বটগাছের ছায়ায় ছোট্ট একটা আশ্রম।

না, জাঁকজমক কিছু নেই। মাটির উঠোন, একপাশে তুলসীমঞ্চ, আর সামনেই মা তারার একটি ছোট মন্দির।

বারান্দায় বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী।

গেরুয়া বসন, শুভ্র দাড়ি, আর আশ্চর্য রকমের শান্ত দুটি চোখ।

অরিন্দম নমস্কার করতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন—

— "কলকাতা থেকে এসেছ?"

অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।

— "কী করে বুঝলেন?"

সন্ন্যাসী হেসে বললেন—

— "এখানে যারা আসে, তাদের পায়ের ধুলো আলাদা হতে পারে, কিন্তু চোখের ভাষা খুব একটা আলাদা হয় না।"

অরিন্দম বারান্দার এক কোণে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ।

তারপর সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন—

— "মায়ের কাছে কী চাইতে এসেছ?"

প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম থমকে গেল।

সত্যিই তো, সে কী চাইতে এসেছে?

অনেকক্ষণ ভেবে বলল—

— "জানি না।"

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

— "এই উত্তরটাই সবচেয়ে সত্যি।"

একটু দূরে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন—

— "এই তারাপীঠে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। কেউ অর্থ চায়, কেউ সাফল্য, কেউ সুস্থতা। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, তার আসল অভাবটা কোথায়।"

বাতাসে বটগাছের পাতা নড়ে উঠল।

সন্ন্যাসী বললেন—

— "বামাক্ষ্যাপার কথা নিশ্চয়ই জানো?"

— "হ্যাঁ, কিছুটা।"

— "লোকের চোখে তিনি ছিলেন খ্যাপা। কিন্তু তিনি জানতেন তিনি কী চান। তাই মা-কে পেয়েছিলেন। আর আমরা? সারাজীবন কী চাই তা-ই ঠিক করে উঠতে পারি না।"

অরিন্দম চুপ করে শুনছিল।

সন্ন্যাসী আবার বললেন—

— "উপনিষদে একটা কথা আছে— 'পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদম্'। এই জগৎ পূর্ণ, মানুষও পূর্ণ। অথচ আমরা সারাজীবন নিজেদের অপূর্ণ ভেবে কাটিয়ে দিই।"

— "কিন্তু মানুষের জীবনে তো অপূর্ণতা থাকেই।"

সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললেন—

— "অপূর্ণতা থাকে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মানুষ নিজের ভেতরের শূন্যতাকে বাইরের জিনিস দিয়ে ভরতে চায়।"

একটু থেমে আবার বললেন—

— "অর্থ দরকার। সম্মান দরকার। সাফল্যও দরকার। কিন্তু এগুলো জীবনের গন্তব্য নয়, পথ চলার উপকরণ মাত্র।"

অরিন্দমের মনে পড়ে গেল নিজের জীবনটা।

বহু বছরের পরিশ্রম, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা...

তবু কোথাও যেন একটা শূন্যতা।

হয়তো সেই কারণেই সে আজ এখানে।

সন্ন্যাসী এবার গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন।

— "তোমার চোখে দ্বন্দ্ব দেখছি।"

অরিন্দম একটু চমকে উঠল।

— "দ্বন্দ্ব?"

— "হ্যাঁ। মন যখন দুই দিকে টানে, তখন চোখের ভেতর একটা অস্থিরতা জন্মায়।"

অরিন্দম কোনো উত্তর দিল না।

সন্ন্যাসী নিজেই বললেন—

— "মনে রেখো, জীবনের বড় সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নেওয়া যায় না। আবার শুধু আবেগ দিয়েও নয়।"

— "তাহলে?"

সন্ন্যাসীর ঠোঁটে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।

— "যেখানে শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে, আর নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা আছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত সেখানেই আশ্রয় খোঁজে।"

কথাগুলো বলে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

মন্দিরের দিকে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকালেন।

— "আর একটা কথা।"

অরিন্দম তাকাল।

— "জীবনসঙ্গী খোঁজার আগে মানুষকে নিজের সঙ্গী হতে শিখতে হয়।"

সন্ন্যাসী চলে গেলেন।

অরিন্দম অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

সকালের আলো তখন আশ্রমের উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তাকে কোনো উত্তর দেননি।

শুধু এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো থেকে এতদিন সে নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।

দূরে তখন মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

আজ তারা মায়ের পূজা দেবে।

কিন্তু তারও আগে, হয়তো নিজের মনের সামনে একবার মাথা নত করা দরকার।

ঈশিতার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিনদিন পর।

সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। উঠোনে ঝরে পড়া জবা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম।

মানুষের জীবনের সঙ্গে এই ঝরে পড়া ফুলগুলোর কী আশ্চর্য মিল!

জীবনের শুরুটা যেন কুঁড়ির মতো। ধীরে ধীরে সে প্রস্ফুটিত হয়, রূপ-রস-গন্ধে ভরে ওঠে। তারপর একদিন অদৃশ্য কোনো নিয়মে রং বদলায়, সৌন্দর্য ম্লান হয়, আর নীরবে বৃন্ত থেকে ঝরে পড়ে।

হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল।

মেঘলার মেসেজ।

"আজ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করতে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গ পেলে মন্দ হয় না।"

অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শুধু লিখল—

"কখন?"

ওপাশ থেকে উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

"এগারোটায়। আম্রকুঞ্জে অপেক্ষা করব।"



শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ।

রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্নে ধন্য সেই মাটি। গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমে এসেছে সোনালি সুতোর মতো। দূরে কোপাই নদীর বালুচরে কয়েকটি শিশু খেলছে।

একটি ছোট টিনের চালের স্কুলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।

পরনে হালকা হলুদ সুতির শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। চারপাশে পনেরো-কুড়িটি বাচ্চা তাকে ঘিরে "দিদি, দিদি" বলে ডাকছে। কারও হাতে স্লেট, কারও হাতে খাতা।

অরিন্দমকে দেখে মেঘলা মৃদু হেসে বলল,

— "এসেছেন? ভাবিনি এত সহজে রাজি হবেন।"

— "ডাকলে না এসে পারি?"

মেঘলা কিছু বলল না। শুধু হাসল।

স্কুলঘরের ভেতরে ঢুকতেই অরিন্দম দেখল, মাটির মেঝে, দেওয়ালে রঙিন ছবি, বাংলা বর্ণমালা, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। এক কোণে রান্না হচ্ছে বাচ্চাদের দুপুরের খাবার।

একটা ছোট মেয়ে এসে অরিন্দমের হাত টানল।

— "কাকু, আপনি চাঁদ দেখতে পারেন?"

অরিন্দম হেসে হাঁটু গেড়ে বসল।

— "এখন তো দিন। চাঁদ কোথায়?"

মেয়েটা গম্ভীর মুখে বলল,

— "দিদি বলে, চাঁদ না থাকলেও আকাশ দেখতে হয়।"

পাশ থেকে মেঘলা হেসে উঠল।

— "শুনলেন? ওরাই আমাকে শেখায়।"

অরিন্দম মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।


দুপুরের দিকে তারা কোপাই নদীর ধারে গিয়ে বসল।

নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় শালপাতা উড়ছে। দূরে এক বাউল একতারা হাতে গান গাইছে।

মেঘলা বালিতে আঙুল দিয়ে অকারণে কিছু রেখা আঁকছিল।

হঠাৎ বলল,

— "জানেন, আমার খুব ইচ্ছে করে আকাশে পাখি হয়ে উড়তে।"

অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,

— "তারপর?"

— "তারপর ডানায় শীতল হাওয়া মেখে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়াতে।"

একটু থেমে আবার বলল,

— "কোনো হিসাব থাকবে না, কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না। শুধু আকাশ থাকবে, আর পথ থাকবে।"

অরিন্দম চুপচাপ শুনছিল।

মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু জমাই—অর্থ, পরিচয়, সাফল্য, দায়িত্ব। কিন্তু কখন যে সেইসবের ভিড়ে নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি, বুঝতেই পারি না।"

— "সব ছেড়ে দিয়ে কি বাঁচা যায়?"

মেঘলা মাথা নাড়ল।

— "না। সব ছেড়ে নয়। কিন্তু সবকিছুর মালিক হয়েও তার দাস না হয়ে।"

কথাটা শুনে অরিন্দমের মনে অদ্ভুত একটা আলোড়ন উঠল।


বিকেলের দিকে স্কুলে ফিরে এলো তারা।

বাচ্চাদের খাওয়ানো, পড়ানো, হাসাহাসি—সবকিছুর মধ্যে মেঘলা এমনভাবে মিশে ছিল, যেন এটাই তার পৃথিবী।

বিদায়ের সময় মেঘলা বলল,

— "আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না, অরিন্দমবাবু।"

অরিন্দম তাকিয়ে রইল।

— "কেন?"

— "কারণ জীবনকে আমি খুব শক্ত করে বেঁধে রাখতে শিখিনি।"

একটু হেসে আবার বলল,

— "শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার আকাশে কেউ যদি পাখি হয়ে আসে, তার ডানায় শীতল হতে আমার আপত্তি নেই।"

কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন অচেনা একটা শব্দ জন্ম নিল।


সন্ধের আগে পলাশডাঙায় ফিরল অরিন্দম।

রাতে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকাল।

চাঁদটা আজ প্রায় পূর্ণ।

জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক।

তার মনে হলো, জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দুটি আলাদা আহ্বান।

একদিকে ঈশিতা—সংযত, স্থির, পরিণত।

অন্যদিকে মেঘলা—মুক্ত, অনিশ্চিত, আকাশের মতো বিস্তৃত।

একজন যেন বলছে,

"ঘরে এসো, আলো জ্বালি।"

আরেকজন যেন ফিসফিস করে বলছে,

"চলো, আকাশ দেখি।"

অরিন্দম দীর্ঘক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— "মানুষ কি সত্যিই নিজের পথ বেছে নেয়, নাকি পথই একদিন মানুষকে বেছে নেয়?"

উত্তর এল না।

শুধু দূরে কোথাও এক বাউলের কণ্ঠ ভেসে এল—

"মনের মানুষ খুঁজে বেড়াই, মনের মাঝেই রয়..."

পলাশডাঙায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।

বাড়ির উঠোনে তখন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলেছে। দূরে বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। ছোটবেলায় এই শব্দগুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো অরিন্দমের। আজ এত বছর পর আবার শুনে মনে হলো, কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলায় না।

গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা ঘরে রেখে সে বারান্দায় এসে বসল।

মামা তখন চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

অরিন্দমকে দেখে বললেন,

— “কী রে, শান্তিনিকেতন ঘুরে এলি?”

অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— “হ্যাঁ।”

— “মেয়েটা কেমন?”

প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম একটু হেসে ফেলল।

মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

— “আমি ঈশিতার কথা জিজ্ঞেস করছি ”

বারান্দার বাতাসে হালকা হাসির ঢেউ উঠল।

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— “ভালো মানুষ।”

মামা কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে দিলেন।

— “ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।”

আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।

দূরে কারও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে এলো।

অরিন্দম হঠাৎ বলল,

— “মামা, একটা কথা বলি?”

— “বল।”

— “কখনও কখনও মনে হয়, আর ভালো লাগছে না।”

মামা অবাক হলেন না।

শুধু জিজ্ঞেস করলেন,

— “কী ভালো লাগছে না?”

অরিন্দম উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ঝরে পড়া জবা ফুলগুলো এখনও মাটিতে ছড়িয়ে আছে।

— “এই দৌড়টা।”

— “সবাই তো দৌড়ায়।”

— “হ্যাঁ। কিন্তু সবাই কি জানে কেন দৌড়াচ্ছে?”

মামা চুপ করে রইলেন।

অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,

— “জীবনের এতগুলো বছর ভেবেছি, আর একটু এগোলেই শান্তি পাব। তারপর আরও একটু। তারপর আরও একটু। এখন মনে হচ্ছে, শান্তিটা সামনে ছিল না। হয়তো কোথাও পেছনেই পড়ে ছিল।”

বৃদ্ধ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন,

— “শেষ পর্যন্ত মানুষ ঘুরে ফিরে নিজের কাছেই আসে রে।”

অরিন্দম উত্তর দিল না।

আকাশে তখন সন্ধ্যাতারা জ্বলতে শুরু করেছে।

মামা আবার বললেন,

— “তা এবার কী ভাবছিস?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

— “জানি না। তবে একটা কথা বুঝেছি। জীবনের বাকি সময়টা শুধু ব্যাংকের হিসাব বাড়ানোর জন্য খরচ করতে চাই না।”

— “চাকরি ছেড়ে দিবি নাকি?”

— “এখনই নয়। তবে হয়তো আর খুব বেশি দিনও নয়।”

মামার চোখে বিস্ময়ের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ফুটে উঠল।

— “অনেক দেরিতে হলেও ঠিক কথাটা ভাবতে শুরু করেছিস।”

অরিন্দম হেসে ফেলল।

— “হতে পারে।”

— “আর বিয়ে?”

প্রশ্নটা এবার হঠাৎ করেই এসে পড়ল।

অরিন্দমের হাসিটা একটু থেমে গেল।

ঈশিতার শান্ত মুখটা মনে পড়ল।

তারপর মেঘলার চোখদুটো।

দুটো মানুষ।

দুটো জীবনদর্শন।

দুটো আলাদা পথ।

মামা আবার বললেন,

— “কাউকে পছন্দ হয়েছে?”

অরিন্দম এবার সরাসরি উত্তর দিল না।

শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “মনে হয়, জীবনে প্রথমবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি সত্যিই ভাবছি।”

মামা মৃদু হেসে বললেন,

— “তাহলে ভালো লক্ষণ।”

বারান্দার সামনে রাত আরও গাঢ় হয়ে আসছিল।

দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে এল।

অরিন্দম হেলান দিয়ে বসে রইল।

অনেকদিন পর তার মনে হলো, সামনে যে পথটা আছে, সেটা হয়তো খুব সহজ হবে না।

কিন্তু এই প্রথম সে পথটাকে ভয়ও পাচ্ছে না।

কারণ বহু বছর পর সে শুধু গন্তব্য নয়—

পথটাকেও দেখতে শুরু করেছে।

কলকাতায় ফেরার দিন হাওড়া স্টেশনে হঠাৎ অন্যন্যার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

প্রথম মুহূর্তে দুজনেই থমকে গিয়েছিল।

অন্যন্যা।

অরিন্দমের কলেজজীবনের প্রেম।

একটা সময় ছিল, যখন তাদের সম্পর্কের কথা পুরো কলেজ জানত। বন্ধুরা ধরে নিয়েছিল, একদিন ওদের বিয়েই হবে।

কিন্তু হয়নি।

সেই সময় অরিন্দমের কাছে জীবন মানে ছিল একটাই—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বড় চাকরি, বড় সাফল্য, বড় পরিচয়।

একদিন অন্যন্যা তাকে বলেছিল,

— "সবকিছুর আগে কি সত্যিই চাকরিটাই?"

আর অরিন্দম উত্তর দিয়েছিল,

— "এখন না লড়লে পরে আফসোস করতে হবে।"

সেদিনের সেই "পরে" আর কোনোদিন আসেনি।

জীবন দুজনকে দুই দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

আজ এত বছর পর আবার মুখোমুখি।

প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গল্প হলো।

খোঁজখবর।

কুশল বিনিময়।

পুরনো দিনের দু-একটা স্মৃতি।

তার বেশি কিছু নয়।

অন্যন্যা জানাল, তার স্বামী কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।

কথাগুলো বলছিল খুব স্বাভাবিক গলায়। যেন জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি তাকে কান্নারও ওপারে নিয়ে গেছে।

অরিন্দম তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

একসময় এই মুখটাই তার সমস্ত পৃথিবী ছিল।

এই মানুষটিকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত না।

কিন্তু আশ্চর্য!

আজ বুকের ভেতর কোনো ঝড় উঠল না।

না হারানোর কষ্ট।

না ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

না কোনো অপূর্ণতার আর্তি।

কিছুই না।

শুধু একধরনের মমতা।

একজন পুরনো পরিচিত মানুষের জন্য শুভকামনা।

ট্রেন ছাড়ার আগে অন্যন্যা হেসে বলল,

— "জানো, অনেক বছর তোমার ওপর রাগ ছিল।"

অরিন্দমও হেসে ফেলল।

— "এখন?"

— "এখন আর নেই। এখন মনে হয়, আমরা দুজনেই আমাদের সময়টাকে বাঁচছিলাম।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,

— "তবে একটা কথা বলি?"

— "বল।"

— "তোমাকে দেখে আজ বুঝলাম, আমরা দুজনেই আর সেই মানুষগুলো নেই।"

অরিন্দম উত্তর দিল না।

কারণ কথাটা সত্যি।

বিদায়ের সময় অন্যন্যা হাত বাড়িয়ে দিল।

অরিন্দম হাতটা ধরল।

এতটুকুই।

হাত ছুঁয়ে গেল, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও কোনো কম্পন উঠল না।

তখনই অরিন্দমের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল।

তাহলে কি প্রেম বলে কিছু নেই?

যে ভালোবাসার জন্য কবিরা কবিতা লিখেছেন, সাহিত্যিকরা উপন্যাস লিখেছেন, নাট্যকাররা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন—সবই কি কল্পনা?

কিছুক্ষণ ভেবেই নিজেকে উত্তর দিল সে।

না।

প্রেম আছে।

নিশ্চয়ই আছে।

কারণ একসময় অন্যন্যাকে সে সত্যিই ভালোবেসেছিল।

সেই অনুভূতি মিথ্যে ছিল না।


ছুটি শেষ হওয়ায় অরিন্দম আবার অফিসে ফিরে এসেছে।

কিন্তু অফিসের সেই পুরনো টেবিল, ফাইলের স্তূপ, মিটিং আর রিপোর্ট—সবকিছু যেন আগের মতো আর লাগছে না। কাজ চলছে ঠিকই, ইমেল খুলছে, ফাইল সই করছে, রিপোর্ট পড়ছে—তবু মনটা কোথাও যেন পুরোপুরি বসে নেই।

মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। শহরের ব্যস্ততা, গাড়ির ভিড়, মানুষের তাড়া—সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে। শুধু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেটার নাম সে ঠিক করে বলতে পারে না।

ছুটির সেই কয়েকটা দিন যেন তার ভেতরে কিছু বদলে দিয়ে গেছে। না, বড় কোনো ঘটনা নয়—কিন্তু একটা অনুভূতি, একটা টান, একটা নীরব প্রশ্ন রেখে গেছে।

অফিসের কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে হঠাৎই বুঝতে পারে—সে কফির স্বাদটা ঠিক অনুভব করছে না, শুধু অভ্যাসটা করছে।

মিটিংয়ে বসে সহকর্মীরা কথা বলছে, প্রেজেন্টেশন চলছে, স্লাইড বদলাচ্ছে—অরিন্দম শুনছে ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন একটা অংশ অনুপস্থিত। মনটা বারবার অন্যদিকে সরে যাচ্ছে, যেন নিজের অজান্তেই কিছু খুঁজছে।

মনে পড়ে যায় পলাশডাঙার কথা।

ফেরার সময় মামা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—

— “তুই কলকাতা থেকে ফিরে আয় পলাশডাঙায়। এই বৃদ্ধ বয়সে আমার আপন বলতে একমাত্র তুই।”

মামিমাও একই কথা বলেছিলেন—

— “আমাদের আর কিসের অভাব? অর্থের তো কোনো সমস্যা নেই। তুই শুধু কাছে থাক।”

সুব্রতও বিদায়ের সময় বলেছিল—

— “এবার নিজের জন্য একটু বাঁচ। সারাজীবন তো অন্য কিছুর জন্যই দৌড়ালি।”

কথাগুলো অরিন্দমের মনে বারবার ফিরে আসে।

জীবনে যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সে চেয়েছিল, বহু আগেই তা অর্জন করেছে। নিজের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য যা দরকার তার চেয়েও অনেক বেশি সঞ্চয় রয়েছে। একসময় যে লক্ষ্যগুলোকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য বলে মনে হতো, সেগুলো এখন অর্জিত বাস্তবতা।

তবু আশ্চর্যভাবে, সেই অর্জনের মধ্যে আর কোনো উত্তেজনা খুঁজে পায় না সে।

একটা নতুন পদ, আরেকটা ইনক্রিমেন্ট, আরও কিছু টাকা—

এইসব ভাবনা আর আগের মতো তাকে আলোড়িত করে না।

বরং মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো হয়তো কোনোদিন ব্যাংকের হিসাবের খাতায় লেখা ছিল না।

তবু সে এখনও কলকাতায়।

এখনও অফিসে আসছে।

যেন কোনো অদৃশ্য সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে পুরোনো জীবন, অন্যদিকে নতুন কোনো সম্ভাবনা।

এরই মধ্যে মাঝেমধ্যে মেঘলার মেসেজ আসে।

কখনও শান্তিনিকেতনের কোনো ছবি।

কখনও কোনো অদ্ভুত ভাবনা।

কখনও শুধু—

“আজ আকাশটা খুব সুন্দর।”

অরিন্দম সব পড়ে।

কখনও উত্তর দেয়, কখনও দেয় না।

কিন্তু বুঝতে পারে, মেয়েটি তার জীবনের ভেতরে একটা নীরব উপস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে।

সেদিন বিকেলে অফিসে বসে একটি ফাইল দেখছিল সে।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

অরিন্দম কল রিসিভ করল।

— “হ্যালো।”

ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠস্বর।

— “আমি ঈশিতা বলছি।”

অরিন্দম একটু অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করল না।

— “বলুন।”

ঈশিতা বলল—

— “আপনি হয়তো অবাক হচ্ছেন আমি ফোন করায়।”

— “না, অবাক না। তবে ফোনটা অপ্রত্যাশিত।”

ওপাশে মৃদু হাসি শোনা গেল।

— “হয়তো তাই। আসলে একটা খবর দেওয়ার জন্য ফোন করলাম।”

— “কী খবর?”

— “আমি সিভিল সার্ভিসের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছি। সামনে ইন্টারভিউ।”

অরিন্দমের মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল।

— “অভিনন্দন। সত্যিই খুব ভালো খবর।”

— “ধন্যবাদ।”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঈশিতা আবার বলল—

— “আসলে আরেকটা কারণে ফোন করেছি।”

— “বলুন।”

— “ইন্টারভিউটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাবা বলেছে ও যাবে আমার সঙ্গে। কিন্তু আমি ওনাকে না করেছি।”

অরিন্দম মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

ঈশিতা ধীরে ধীরে বলল—

— “আমি সবসময় নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, এত বড় একটা ইন্টারভিউয়ের আগে একটু নার্ভাস লাগছে।”

একটু থেমে সে আবার বলল—

— “আপনি যদি ওইদিন একটু সময় দিতে পারেন...”

অরিন্দম চুপ করে রইল।

ঈশিতা দ্রুত যোগ করল—

— “না না, কোনো অসুবিধা হলে ভুলে যান। আমি শুধু ভেবেছিলাম... আপনি থাকলে ভালো লাগবে।”

— “আমি থাকলে?”

— “হ্যাঁ।”

ওপাশের গলাটা এবার খুব স্বাভাবিক, খুব আন্তরিক শোনাল।

— “আপনি হয়তো বিষয়টাকে খুব সাধারণভাবে নেবেন। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয়, তারা থাকলে অকারণেই একটা ভরসা পাওয়া যায়।”

অরিন্দম কিছু বলল না।

ঈশিতা বলেই চলল—

— “আমি জানি না কেন। হয়তো আমাদের খুব বেশি পরিচয়ও নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলার পর মনে হয়েছে, আপনি পাশে থাকলে আমি আরও আত্মবিশ্বাসী বোধ করব।”

কথাটা শুনে অরিন্দমের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।

বহু বছর ধরে মানুষ তাকে চিনেছে তার পদমর্যাদার জন্য। তার সাফল্যের জন্য। তার অবস্থানের জন্য।

কিন্তু আজ একজন মানুষ তাকে ডাকছে অন্য কারণে।

কোনো সমস্যা সমাধান করার জন্য নয়।

কোনো প্রভাব খাটানোর জন্য নয়।

শুধু তার উপস্থিতির জন্য।

শুধু এই বিশ্বাসে যে, সে পাশে থাকলে সাহস বাড়বে।

অদ্ভুতভাবে কথাটা তার ভালো লাগল।

হয়তো কারণ বহুদিন পর সে অনুভব করল—তার মূল্য শুধু তার পরিচয়ে নয়, তার মানুষ হিসেবেও।

ঈশিতা আবার বলল—

— “আপনি কি পারবেন?”

অরিন্দম ধীরে বলল—

— “হ্যাঁ, পারব।”

ওপাশে স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা গেল।

— “ধন্যবাদ।”

ফোনটা কেটে গেল।

অরিন্দম অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।

কলকাতার আকাশে মেঘ জমছে।

নিচে মানুষের ভিড়, গাড়ির সারি, শহরের অবিরাম ছুটে চলা।

আর তার মনে হলো—

জীবনের সব অর্জন হয়তো সংখ্যায় মাপা যায় না।

কিছু অর্জন আসে খুব নীরবে।

যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বলে—

“আপনি থাকলে আমার সাহস বাড়ে।”

ফোনটা কেটে গেল।


ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল।

​খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া—

​— "আপনি তো আসছেন, তাই না?"

​প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর—

​— "হ্যাঁ, আসছি।"

​ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে আক্ষরিক অর্থেই নিজের জন্য নিচ্ছে।

​ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— 'ঈশিতা'।

​ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত গলা। তবে আজ সেই কণ্ঠে কেমন যেন এক অস্থির সুর।

​— "ব্যস্ত আছেন?"

​— "না, বলুন।"

​ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল—

​— "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো কত প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।"

​অরিন্দম হালকা হেসে ফেলল।

​— "এটা খুব স্বাভাবিক।"

​— "স্বাভাবিক?"

​— "হ্যাঁ। যে পরীক্ষাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাকে নিয়ে কেউ এত দুশ্চিন্তা করে না।"

​ওপাশে নীরবতা। ঈশিতা আবার বলল—

​— "তবু ভয় করছে। যদি ভালো না হয়?"

​অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিল। তার নিজের জীবনের কত পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ, প্রথম বড় দায়িত্ব, প্রথম ব্যর্থতা, প্রথম সাফল্য। সে ধীরে ধীরে বলল—

​— "তুমি জানো, বেশিরভাগ মানুষ ইন্টারভিউকে বিচারসভা ভাবে।"

​— "আর আপনি?"

​— "আমি মনে করি, এটা একটা কথোপকথন। ওরা তোমাকে ফেল করানোর জন্য বসে নেই। ওরা শুধু জানতে চায় তুমি কে, কী ভাবো, কীভাবে সিদ্ধান্ত নাও।"

​— "কিন্তু যদি আটকে যাই?"

​— "তাহলে সোজাসুজি বলবে—'আমি জানি না।' সব উত্তর জানা মানুষের চেয়ে, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে পারা মানুষকে আমি বেশি বিশ্বাস করি।"

​ওপাশ থেকে খুব হালকা একটা হাসির শব্দ এল। অনেকক্ষণ পর যেন সে খানিকটা স্বস্তি পেল।

​— "আপনি এত নিশ্চিন্তভাবে কথা বলেন কীভাবে?"

​অরিন্দম জানালার বাইরে তাকাল। বিকেলের নরম আলোয় চারপাশটা শান্ত হয়ে আসছে। সে মৃদু স্বরে বলল—

​— "কারণ আমি জানি, ঈশিতা—তোমার ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশি।"

​— "এতটা বিশ্বাস?"

​— "হ্যাঁ।"

​ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বলল—

​— "জানেন, আমার বাবা ছোটবেলা থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমার পাশে থেকেছেন। কালই প্রথমবার তিনি পাশে থাকবেন না।"

​কথাটা বলেই সে থেমে গেল। অরিন্দম এবার বুঝতে পারল, আসল নার্ভাসনেসটা ইন্টারভিউ নিয়ে নয়। একটা অভ্যাসের অনুপস্থিতি নিয়ে, একটা চেনা আশ্রয়ের অভাব নিয়ে। সে শান্ত গলায় বলল—

​— "সবসময় যে একই মানুষ পাশে থাকবে, এমন তো নয়। কিন্তু মানুষ কখনো একা থাকে না।"

​— "মানে?"

​— "মানে, কাল যখন তুমি ইন্টারভিউয়ের ঘরে ঢুকবে, তখন তোমার সাথে থাকবে তোমার কঠোর পরিশ্রম, তোমার আত্মবিশ্বাস আর তোমার বাবা-মায়ের আশীর্বাদ। আর ঠিক বাইরে—আমি থাকব।"

​ওপাশে এক দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। তারপর খুব অস্ফুট স্বরে ঈশিতা বলল—

​— "ধন্যবাদ।"

​অরিন্দম হাসল।

​— "ধন্যবাদটা কাল দিও। আগে ইন্টারভিউটা দাও।"

​ঈশিতা এবার প্রাণ খুলে হাসল। সেই হাসির রেশে উদ্বেগ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। ফোন রাখার আগে সে শুধু বলল—

​— "আজ রাতে হয়তো ভালো ঘুম হবে।"

​— "হবে। আর না হলেও সমস্যা নেই। কালকের সকালটা একদম নতুন করে শুরু হবে।"

​অরিন্দম কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল। ডেস্কের ওপর খোলা ফাইল, অসমাপ্ত রিপোর্ট, মেইলের অন্তহীন তালিকা—সবই সামনে পড়ে আছে, কিন্তু তার মন আর সেদিকে ফিরছে না। বারবার কানে বাজছে ঈশিতার সেই আর্তস্বর—"কালই প্রথমবার বাবা পাশে থাকবেন না।"

​কথাটা শোনার মুহূর্তেই সে বুঝেছিল, ঈশিতার ভয়টা আসলে ইন্টারভিউ নিয়ে নয়। সারা জীবন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে যে মানুষটির উপস্থিতি তার ঢাল হয়ে থেকেছে, কাল সেই মানুষটি থাকছেন না। আর সেই চেনা আশ্রয়ের শূন্য জায়গায় অদ্ভুতভাবে আজ সে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে।

​অরিন্দমের কাছে এই উপলব্ধিটা ছিল অপ্রত্যাশিত। তাদের পরিচয়ের সময়সীমা খুব বেশি নয়, অথচ এই অল্প সময়েই ঈশিতা তাকে এমন একজনের আসনে বসিয়েছে, যার উপস্থিতি তাকে সাহস জোগায়। যার কাছে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, যার সামনে ভয়টাকে আড়াল করার প্রয়োজন পড়ে না।

​জীবনের এতগুলো বছর সে নানা মানুষের সাথে কাজ করেছে। অনেকে তার সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা করেছে, তার দক্ষতার ওপর আস্থা রেখেছে। কিন্তু একজন মানুষ যে শুধু এই কারণে তাকে পাশে চাইছে যে—তাকে দেখলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়—এ অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। খুব নীরব, খুব গভীর, এবং এক অদ্ভুত মায়ায় ভরা।

​অরিন্দম ধীরে ধীরে ডেস্কের ওপর রাখা ছুটির অনুমোদনপত্রটার দিকে তাকাল। আগামীকাল সে সেখানে থাকবে। কোনো বড় কাজ করার জন্য নয়, কোনো জটিল উপদেশ দেওয়ার জন্যও নয়। শুধুমাত্র এইটুকু নিশ্চিত করার জন্য যে, ইন্টারভিউ বোর্ডের ভারী দরজা ঠেলে ঈশিতা যখন বাইরে বেরিয়ে আসবে, তখন যেন তার চোখে প্রথম যে মুখটা ভাসে, সেটি হয় একজন ভরসাসূচক মানুষের। তাকে যেন মনে হয়—সে একা নয়।

​এই ভাবনাটা অরিন্দমের মুখে অজান্তেই এক টুকরো স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে তুলল। অনেকদিন পর নিজের জীবনের চেয়ে অন্যের জীবনের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের অংশীদার হওয়া তার কাছে অর্থপূর্ণ মনে হলো।

​সে বুঝল, অফিসের ফাইলের হিসাব আর পদমর্যাদার বাইরেও মানুষের জীবনের কিছু কাজ থাকে, যার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু সেই কাজের মূল্য কোনো বেতনের অঙ্কে মাপা যায় না। কখনও কখনও শুধু কারও পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকাটাও এক ধরনের পূর্ণতা।


Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...