গাড়িটা তারাপীঠের দিকে যত এগোচ্ছিল, অরিন্দমের মনের ভেতর ততই একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছিল। জানালার বাইরে লাল মাটির রাস্তা, দুপাশে শাল-পিয়ালের সারি। সুব্রত পাশে বসে মাঝে মাঝে কথা বলছে, কিন্তু অরিন্দমের কানে কথাগুলো ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছিল না।
তারাপীঠে পৌঁছে হোটেলে চেক-ইন করেই অরিন্দম প্রথমে স্নান সেরে নিল। সুব্রত বলল, "চল, মন্দিরে যাই। সন্ধ্যারতি দেখব।"
অরিন্দম মাথা নাড়ল। কিন্তু পা দুটো যেন একটু ভারী লাগছিল।
মন্দির চত্বরে ঢুকতেই শঙ্খ-কাঁসরের শব্দ, ভক্তদের ভিড়, "জয় তারা মা" ধ্বনি—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অরিন্দম চোখ বুজল। প্রার্থনা করতে গিয়ে সে বুঝল, সে আসলে কী চাইছে তা নিজেই জানে না। পদোন্নতি? না। অর্থ? না।
শুধু একটু শান্তি। একটু... ঘর।
পূজা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, সুব্রত ফোনে কথা বলছে। ফোন রাখতেই বলল, "জানিস, মামা ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছিল ঈশিতাকে কেমন লাগল।"
অরিন্দম হাসল। "কী বলব বল? "
"মেয়েটি বুদ্ধিমতী। আর কিছু না?" সুব্রত চোখ টিপল।
অরিন্দম উত্তর দিল না। আকাশের দিকে তাকাল। তারার মাঝে চাঁদটা আজ আবার উঠেছে। গোল, শান্ত, নির্লিপ্ত। ঠিক গতরাতের মতোই।
রাতে খাওয়ার পর দুজনে ছাদে গিয়ে বসল। শহরের কোলাহল নেই এখানে। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে শ্মশানের চিতার আলো।
সুব্রত হঠাৎ বলল, "আচ্ছা অরিন্দম, তোর কি মনে হয় না... জীবনের চল্লিশের পর প্রেম-ভালোবাসা একটু অন্যরকম হয়ে যায়?"
"কেমন?"
"টগবগে হয় না। বরং ধীর, স্থির। যেন দুজন বয়স্ক মানুষ এক কাপ চা নিয়ে বসেছে। কারও তাড়া নেই। শুধু পাশে থাকাটাই যথেষ্ট।"
অরিন্দম চুপ করে রইল। পকেট থেকে মোবাইল বের করল। স্ক্রিনে তখনও মেঘলার শেষ মেসেজটা ভাসছে—
*"কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"*
আর তার ঠিক নিচেই ঈশিতার বাবার নাম্বার সেভ করা। মামা পাঠিয়েছিলেন।
দুটো নাম। দুটো পথ।
একটা পথে অস্থিরতা আছে, প্রশ্ন আছে, অনিশ্চয়তা আছে।
আরেকটা পথে শান্তি আছে, বোঝাপড়া আছে, সময় আছে।
অরিন্দম আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ছোটবেলায় সে চাঁদের সঙ্গে পথ চলত। এখন চাঁদটা ঠিকই আছে, কিন্তু সে নিজেই হারিয়ে গেছে ভিড়ের মধ্যে।
হঠাৎ মোবাইলটা আবার ভাইব্রেট করল। নতুন মেসেজ।
নাম দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল— *মেঘলা*।
মেসেজটা ছোট:
*"তারাপীঠে চাঁদটা কি আজও আপনার সঙ্গে পথ চলছে?"*
অরিন্দম অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘলা জানল কী করে সে তারাপীঠে? সৌমেন নিশ্চয়ই বলেছে।সৌমেন কে ফোনে বলেছিল তারাপীঠ যাবে।
সে আঙুল দিয়ে টাইপ করল, আবার মুছে দিল। কী উত্তর দেবে? "হ্যাঁ, চলছে"? নাকি "না, আমি হারিয়ে গেছি"?
শেষে শুধু লিখল—
*"চাঁদটা আছে। আমি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি।"*
সেন্ড বাটন টিপতেই ওপার থেকে রিপ্লাই এল প্রায় সঙ্গে—
*"খুঁজবেন না। থেমে যান। চাঁদ হারায় না, মানুষই চাঁদের নিচে দাঁড়াতে ভুলে যায়।"*
মেসেজটা পড়ে অরিন্দমের চোখ ভিজে এল কিনা বোঝা গেল না। শুধু বুঝল, বহুদিন পর কেউ তাকে থামতে বলল। দৌড়াতে না।
সুব্রত পাশ থেকে বলল, "কী রে? কার মেসেজ?"
অরিন্দম মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে বলল, "কেউ না। পুরোনো একটা বন্ধু।"
আকাশের চাঁদটা তখন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। জ্যোৎস্না এসে পড়েছে ছাদের মেঝেতে।
অরিন্দম চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে হোটেলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় এল।
রাতের তারাপীঠ শান্ত। দোকানপাট বন্ধ। শুধু মন্দিরের দিক থেকে ভেসে আসছে মায়ের নামগান।
সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। অনেক বছর পর সে চাঁদটাকে শুধু দেখল না।
*দেখা হয়ে উঠল।*
আর মনে হলো—হয়তো জীবনের নতুন অধ্যায়টা শুরু করার জন্য খুব জোরে দৌড়াতে হয় না। মাঝে মাঝে শুধু থেমে, আকাশের দিকে তাকালেই হয়।
পকেটে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল।
এবার মেসেজটা ঈশিতার বাবার কাছ থেকে—
*"মেয়ে বলেছে, আপনাদের কথা ওর ভালো লেগেছে। আপনিও যদি রাজি থাকেন, আমরা সামনের মাসে দিন দেখতে চাই।"*
অরিন্দম মেসেজটা পড়ল। পড়ে রেখে দিল। উত্তর দিল না।
তার সামনে দুটো দরজা। একটা শান্তির, আরেকটা অস্থিরতার।
কোন দরজাটা খুলবে সে, তা এখনও সে নিজেই জানে না।
শুধু জানে, আজ রাতে চাঁদটা আর নির্লিপ্ত লাগছে না।
বরং মনে হচ্ছে, বহু বছর পর চাঁদটাও যেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।
পরদিন ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল অরিন্দমের।
হোটেলের জানালা খুলতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আভা ফুটতে শুরু করেছে।
সুব্রত তখনও ঘুমিয়ে।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।
সকালের তারাপীঠ যেন রাতের তারাপীঠ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভিড় এখনও জমেনি। রাস্তার দু'পাশে কয়েকজন ভক্ত, হাতে ফুল-বেলপাতা। কোথাও শঙ্খধ্বনি, কোথাও মন্দিরের ঘণ্টার মৃদু শব্দ।
হাঁটতে হাঁটতে সে মূল রাস্তা ছেড়ে একটু ভেতরের দিকে চলে গেল।
একটা পুরনো বটগাছের ছায়ায় ছোট্ট একটা আশ্রম।
না, জাঁকজমক কিছু নেই। মাটির উঠোন, একপাশে তুলসীমঞ্চ, আর সামনেই মা তারার একটি ছোট মন্দির।
বারান্দায় বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী।
গেরুয়া বসন, শুভ্র দাড়ি, আর আশ্চর্য রকমের শান্ত দুটি চোখ।
অরিন্দম নমস্কার করতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন—
— "কলকাতা থেকে এসেছ?"
অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।
— "কী করে বুঝলেন?"
সন্ন্যাসী হেসে বললেন—
— "এখানে যারা আসে, তাদের পায়ের ধুলো আলাদা হতে পারে, কিন্তু চোখের ভাষা খুব একটা আলাদা হয় না।"
অরিন্দম বারান্দার এক কোণে বসল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ।
তারপর সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন—
— "মায়ের কাছে কী চাইতে এসেছ?"
প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম থমকে গেল।
সত্যিই তো, সে কী চাইতে এসেছে?
অনেকক্ষণ ভেবে বলল—
— "জানি না।"
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— "এই উত্তরটাই সবচেয়ে সত্যি।"
একটু দূরে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন—
— "এই তারাপীঠে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। কেউ অর্থ চায়, কেউ সাফল্য, কেউ সুস্থতা। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, তার আসল অভাবটা কোথায়।"
বাতাসে বটগাছের পাতা নড়ে উঠল।
সন্ন্যাসী বললেন—
— "বামাক্ষ্যাপার কথা নিশ্চয়ই জানো?"
— "হ্যাঁ, কিছুটা।"
— "লোকের চোখে তিনি ছিলেন খ্যাপা। কিন্তু তিনি জানতেন তিনি কী চান। তাই মা-কে পেয়েছিলেন। আর আমরা? সারাজীবন কী চাই তা-ই ঠিক করে উঠতে পারি না।"
অরিন্দম চুপ করে শুনছিল।
সন্ন্যাসী আবার বললেন—
— "উপনিষদে একটা কথা আছে— 'পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদম্'। এই জগৎ পূর্ণ, মানুষও পূর্ণ। অথচ আমরা সারাজীবন নিজেদের অপূর্ণ ভেবে কাটিয়ে দিই।"
— "কিন্তু মানুষের জীবনে তো অপূর্ণতা থাকেই।"
সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললেন—
— "অপূর্ণতা থাকে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মানুষ নিজের ভেতরের শূন্যতাকে বাইরের জিনিস দিয়ে ভরতে চায়।"
একটু থেমে আবার বললেন—
— "অর্থ দরকার। সম্মান দরকার। সাফল্যও দরকার। কিন্তু এগুলো জীবনের গন্তব্য নয়, পথ চলার উপকরণ মাত্র।"
অরিন্দমের মনে পড়ে গেল নিজের জীবনটা।
বহু বছরের পরিশ্রম, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা...
তবু কোথাও যেন একটা শূন্যতা।
হয়তো সেই কারণেই সে আজ এখানে।
সন্ন্যাসী এবার গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন।
— "তোমার চোখে দ্বন্দ্ব দেখছি।"
অরিন্দম একটু চমকে উঠল।
— "দ্বন্দ্ব?"
— "হ্যাঁ। মন যখন দুই দিকে টানে, তখন চোখের ভেতর একটা অস্থিরতা জন্মায়।"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিল না।
সন্ন্যাসী নিজেই বললেন—
— "মনে রেখো, জীবনের বড় সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নেওয়া যায় না। আবার শুধু আবেগ দিয়েও নয়।"
— "তাহলে?"
সন্ন্যাসীর ঠোঁটে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
— "যেখানে শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে, আর নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা আছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত সেখানেই আশ্রয় খোঁজে।"
কথাগুলো বলে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
মন্দিরের দিকে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকালেন।
— "আর একটা কথা।"
অরিন্দম তাকাল।
— "জীবনসঙ্গী খোঁজার আগে মানুষকে নিজের সঙ্গী হতে শিখতে হয়।"
সন্ন্যাসী চলে গেলেন।
অরিন্দম অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
সকালের আলো তখন আশ্রমের উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তাকে কোনো উত্তর দেননি।
শুধু এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো থেকে এতদিন সে নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
দূরে তখন মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে।
অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
আজ তারা মায়ের পূজা দেবে।
কিন্তু তারও আগে, হয়তো নিজের মনের সামনে একবার মাথা নত করা দরকার।
ঈশিতার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিনদিন পর।
সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। উঠোনে ঝরে পড়া জবা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম।
মানুষের জীবনের সঙ্গে এই ঝরে পড়া ফুলগুলোর কী আশ্চর্য মিল!
জীবনের শুরুটা যেন কুঁড়ির মতো। ধীরে ধীরে সে প্রস্ফুটিত হয়, রূপ-রস-গন্ধে ভরে ওঠে। তারপর একদিন অদৃশ্য কোনো নিয়মে রং বদলায়, সৌন্দর্য ম্লান হয়, আর নীরবে বৃন্ত থেকে ঝরে পড়ে।
হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল।
মেঘলার মেসেজ।
— "আজ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করতে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গ পেলে মন্দ হয় না।"
অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শুধু লিখল—
— "কখন?"
ওপাশ থেকে উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
— "এগারোটায়। আম্রকুঞ্জে অপেক্ষা করব।"
শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ।
রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্নে ধন্য সেই মাটি। গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমে এসেছে সোনালি সুতোর মতো। দূরে কোপাই নদীর বালুচরে কয়েকটি শিশু খেলছে।
একটি ছোট টিনের চালের স্কুলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।
পরনে হালকা হলুদ সুতির শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। চারপাশে পনেরো-কুড়িটি বাচ্চা তাকে ঘিরে "দিদি, দিদি" বলে ডাকছে। কারও হাতে স্লেট, কারও হাতে খাতা।
অরিন্দমকে দেখে মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— "এসেছেন? ভাবিনি এত সহজে রাজি হবেন।"
— "ডাকলে না এসে পারি?"
মেঘলা কিছু বলল না। শুধু হাসল।
স্কুলঘরের ভেতরে ঢুকতেই অরিন্দম দেখল, মাটির মেঝে, দেওয়ালে রঙিন ছবি, বাংলা বর্ণমালা, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। এক কোণে রান্না হচ্ছে বাচ্চাদের দুপুরের খাবার।
একটা ছোট মেয়ে এসে অরিন্দমের হাত টানল।
— "কাকু, আপনি চাঁদ দেখতে পারেন?"
অরিন্দম হেসে হাঁটু গেড়ে বসল।
— "এখন তো দিন। চাঁদ কোথায়?"
মেয়েটা গম্ভীর মুখে বলল,
— "দিদি বলে, চাঁদ না থাকলেও আকাশ দেখতে হয়।"
পাশ থেকে মেঘলা হেসে উঠল।
— "শুনলেন? ওরাই আমাকে শেখায়।"
অরিন্দম মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুপুরের দিকে তারা কোপাই নদীর ধারে গিয়ে বসল।
নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় শালপাতা উড়ছে। দূরে এক বাউল একতারা হাতে গান গাইছে।
মেঘলা বালিতে আঙুল দিয়ে অকারণে কিছু রেখা আঁকছিল।
হঠাৎ বলল,
— "জানেন, আমার খুব ইচ্ছে করে আকাশে পাখি হয়ে উড়তে।"
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,
— "তারপর?"
— "তারপর ডানায় শীতল হাওয়া মেখে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়াতে।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "কোনো হিসাব থাকবে না, কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না। শুধু আকাশ থাকবে, আর পথ থাকবে।"
অরিন্দম চুপচাপ শুনছিল।
মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু জমাই—অর্থ, পরিচয়, সাফল্য, দায়িত্ব। কিন্তু কখন যে সেইসবের ভিড়ে নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি, বুঝতেই পারি না।"
— "সব ছেড়ে দিয়ে কি বাঁচা যায়?"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "না। সব ছেড়ে নয়। কিন্তু সবকিছুর মালিক হয়েও তার দাস না হয়ে।"
কথাটা শুনে অরিন্দমের মনে অদ্ভুত একটা আলোড়ন উঠল।
বিকেলের দিকে স্কুলে ফিরে এলো তারা।
বাচ্চাদের খাওয়ানো, পড়ানো, হাসাহাসি—সবকিছুর মধ্যে মেঘলা এমনভাবে মিশে ছিল, যেন এটাই তার পৃথিবী।
বিদায়ের সময় মেঘলা বলল,
— "আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না, অরিন্দমবাবু।"
অরিন্দম তাকিয়ে রইল।
— "কেন?"
— "কারণ জীবনকে আমি খুব শক্ত করে বেঁধে রাখতে শিখিনি।"
একটু হেসে আবার বলল,
— "শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার আকাশে কেউ যদি পাখি হয়ে আসে, তার ডানায় শীতল হতে আমার আপত্তি নেই।"
কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।
অরিন্দম উত্তর দিল না।
কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন অচেনা একটা শব্দ জন্ম নিল।
সন্ধের আগে পলাশডাঙায় ফিরল অরিন্দম।
রাতে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকাল।
চাঁদটা আজ প্রায় পূর্ণ।
জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক।
তার মনে হলো, জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দুটি আলাদা আহ্বান।
একদিকে ঈশিতা—সংযত, স্থির, পরিণত।
অন্যদিকে মেঘলা—মুক্ত, অনিশ্চিত, আকাশের মতো বিস্তৃত।
একজন যেন বলছে,
"ঘরে এসো, আলো জ্বালি।"
আরেকজন যেন ফিসফিস করে বলছে,
"চলো, আকাশ দেখি।"
অরিন্দম দীর্ঘক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— "মানুষ কি সত্যিই নিজের পথ বেছে নেয়, নাকি পথই একদিন মানুষকে বেছে নেয়?"
উত্তর এল না।
শুধু দূরে কোথাও এক বাউলের কণ্ঠ ভেসে এল—
"মনের মানুষ খুঁজে বেড়াই, মনের মাঝেই রয়..."
পলাশডাঙায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।
বাড়ির উঠোনে তখন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলেছে। দূরে বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। ছোটবেলায় এই শব্দগুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো অরিন্দমের। আজ এত বছর পর আবার শুনে মনে হলো, কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলায় না।
গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা ঘরে রেখে সে বারান্দায় এসে বসল।
মামা তখন চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
অরিন্দমকে দেখে বললেন,
— “কী রে, শান্তিনিকেতন ঘুরে এলি?”
অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “মেয়েটা কেমন?”
প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম একটু হেসে ফেলল।
মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— “আমি ঈশিতার কথা জিজ্ঞেস করছি ”
বারান্দার বাতাসে হালকা হাসির ঢেউ উঠল।
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— “ভালো মানুষ।”
মামা কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে দিলেন।
— “ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।”
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।
দূরে কারও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে এলো।
অরিন্দম হঠাৎ বলল,
— “মামা, একটা কথা বলি?”
— “বল।”
— “কখনও কখনও মনে হয়, আর ভালো লাগছে না।”
মামা অবাক হলেন না।
শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
— “কী ভালো লাগছে না?”
অরিন্দম উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝরে পড়া জবা ফুলগুলো এখনও মাটিতে ছড়িয়ে আছে।
— “এই দৌড়টা।”
— “সবাই তো দৌড়ায়।”
— “হ্যাঁ। কিন্তু সবাই কি জানে কেন দৌড়াচ্ছে?”
মামা চুপ করে রইলেন।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,
— “জীবনের এতগুলো বছর ভেবেছি, আর একটু এগোলেই শান্তি পাব। তারপর আরও একটু। তারপর আরও একটু। এখন মনে হচ্ছে, শান্তিটা সামনে ছিল না। হয়তো কোথাও পেছনেই পড়ে ছিল।”
বৃদ্ধ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
— “শেষ পর্যন্ত মানুষ ঘুরে ফিরে নিজের কাছেই আসে রে।”
অরিন্দম উত্তর দিল না।
আকাশে তখন সন্ধ্যাতারা জ্বলতে শুরু করেছে।
মামা আবার বললেন,
— “তা এবার কী ভাবছিস?”
অরিন্দম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— “জানি না। তবে একটা কথা বুঝেছি। জীবনের বাকি সময়টা শুধু ব্যাংকের হিসাব বাড়ানোর জন্য খরচ করতে চাই না।”
— “চাকরি ছেড়ে দিবি নাকি?”
— “এখনই নয়। তবে হয়তো আর খুব বেশি দিনও নয়।”
মামার চোখে বিস্ময়ের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ফুটে উঠল।
— “অনেক দেরিতে হলেও ঠিক কথাটা ভাবতে শুরু করেছিস।”
অরিন্দম হেসে ফেলল।
— “হতে পারে।”
— “আর বিয়ে?”
প্রশ্নটা এবার হঠাৎ করেই এসে পড়ল।
অরিন্দমের হাসিটা একটু থেমে গেল।
ঈশিতার শান্ত মুখটা মনে পড়ল।
তারপর মেঘলার চোখদুটো।
দুটো মানুষ।
দুটো জীবনদর্শন।
দুটো আলাদা পথ।
মামা আবার বললেন,
— “কাউকে পছন্দ হয়েছে?”
অরিন্দম এবার সরাসরি উত্তর দিল না।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মনে হয়, জীবনে প্রথমবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি সত্যিই ভাবছি।”
মামা মৃদু হেসে বললেন,
— “তাহলে ভালো লক্ষণ।”
বারান্দার সামনে রাত আরও গাঢ় হয়ে আসছিল।
দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে এল।
অরিন্দম হেলান দিয়ে বসে রইল।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, সামনে যে পথটা আছে, সেটা হয়তো খুব সহজ হবে না।
কিন্তু এই প্রথম সে পথটাকে ভয়ও পাচ্ছে না।
কারণ বহু বছর পর সে শুধু গন্তব্য নয়—
পথটাকেও দেখতে শুরু করেছে।
কলকাতায় ফেরার দিন হাওড়া স্টেশনে হঠাৎ অন্যন্যার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
প্রথম মুহূর্তে দুজনেই থমকে গিয়েছিল।
অন্যন্যা।
অরিন্দমের কলেজজীবনের প্রেম।
একটা সময় ছিল, যখন তাদের সম্পর্কের কথা পুরো কলেজ জানত। বন্ধুরা ধরে নিয়েছিল, একদিন ওদের বিয়েই হবে।
কিন্তু হয়নি।
সেই সময় অরিন্দমের কাছে জীবন মানে ছিল একটাই—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বড় চাকরি, বড় সাফল্য, বড় পরিচয়।
একদিন অন্যন্যা তাকে বলেছিল,
— "সবকিছুর আগে কি সত্যিই চাকরিটাই?"
আর অরিন্দম উত্তর দিয়েছিল,
— "এখন না লড়লে পরে আফসোস করতে হবে।"
সেদিনের সেই "পরে" আর কোনোদিন আসেনি।
জীবন দুজনকে দুই দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
আজ এত বছর পর আবার মুখোমুখি।
প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গল্প হলো।
খোঁজখবর।
কুশল বিনিময়।
পুরনো দিনের দু-একটা স্মৃতি।
তার বেশি কিছু নয়।
অন্যন্যা জানাল, তার স্বামী কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
কথাগুলো বলছিল খুব স্বাভাবিক গলায়। যেন জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি তাকে কান্নারও ওপারে নিয়ে গেছে।
অরিন্দম তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় এই মুখটাই তার সমস্ত পৃথিবী ছিল।
এই মানুষটিকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত না।
কিন্তু আশ্চর্য!
আজ বুকের ভেতর কোনো ঝড় উঠল না।
না হারানোর কষ্ট।
না ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
না কোনো অপূর্ণতার আর্তি।
কিছুই না।
শুধু একধরনের মমতা।
একজন পুরনো পরিচিত মানুষের জন্য শুভকামনা।
ট্রেন ছাড়ার আগে অন্যন্যা হেসে বলল,
— "জানো, অনেক বছর তোমার ওপর রাগ ছিল।"
অরিন্দমও হেসে ফেলল।
— "এখন?"
— "এখন আর নেই। এখন মনে হয়, আমরা দুজনেই আমাদের সময়টাকে বাঁচছিলাম।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
— "তবে একটা কথা বলি?"
— "বল।"
— "তোমাকে দেখে আজ বুঝলাম, আমরা দুজনেই আর সেই মানুষগুলো নেই।"
অরিন্দম উত্তর দিল না।
কারণ কথাটা সত্যি।
বিদায়ের সময় অন্যন্যা হাত বাড়িয়ে দিল।
অরিন্দম হাতটা ধরল।
এতটুকুই।
হাত ছুঁয়ে গেল, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও কোনো কম্পন উঠল না।
তখনই অরিন্দমের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল।
তাহলে কি প্রেম বলে কিছু নেই?
যে ভালোবাসার জন্য কবিরা কবিতা লিখেছেন, সাহিত্যিকরা উপন্যাস লিখেছেন, নাট্যকাররা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন—সবই কি কল্পনা?
কিছুক্ষণ ভেবেই নিজেকে উত্তর দিল সে।
না।
প্রেম আছে।
নিশ্চয়ই আছে।
কারণ একসময় অন্যন্যাকে সে সত্যিই ভালোবেসেছিল।
সেই অনুভূতি মিথ্যে ছিল না।
Comments
Post a Comment