Skip to main content

পর্ব–৮ :প্রেম চিরন্তন

ছায়ার ভেতর নতুন আলো

স্টেশনটা তার চেনা। তবু অনেক কিছু বদলে গেছে। প্ল্যাটফর্ম আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার, পরিপাটি। নতুন ছাউনি, আধুনিক অপেক্ষাকক্ষ, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড—সব মিলিয়ে যেন নতুন এক চেহারা পেয়েছে।

অরিন্দমের মনে হলো, গত কয়েক বছরে দেশের রেলব্যবস্থা সত্যিই অনেকটা বদলেছে। উন্নয়নের ছাপ চোখে পড়ার মতো।

স্টেশনের বাইরে বেরোতেই দেখতে পেল, মামা আগেভাগেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ড্রাইভার হরিপদ তাকে দেখেই এগিয়ে এল।

— "আসুন দাদাবাবু, সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।"

অরিন্দম মৃদু হেসে গাড়িতে উঠে বসল।

বোলপুর শহর পেরিয়ে গাড়ি যখন লালমাটির গ্রামের রাস্তা ধরে এগোতে শুরু করল, তখন তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে উঠল। কত বছর পরে সে এই পথে ফিরছে!

রাস্তার দুপাশে ধানখেত, কোথাও পলাশ গাছ, কোথাও তাল আর খেজুরের সারি। পরিচিত দৃশ্যগুলো যেন বহুদিনের পুরোনো বন্ধুর মতো তাকে স্বাগত জানাচ্ছিল।

দুপুর গড়িয়ে প্রায় একটা বাজতে চলল, যখন গাড়ি পলাশডাঙার জমিদারবাড়ির বিশাল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল।

ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অরিন্দম দেখতে পেল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন মামা আর মামিমা।

মনে হলো, যেন তারা অনেকক্ষণ ধরেই পথের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

গাড়ি থামার আগেই মামিমা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন।

— "এতদিন পরে আসার সময় হলো বাবা?"

কথাটা বললেও গলায় অভিমানের চেয়ে স্নেহই বেশি ছিল।

অরিন্দম গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে মামার, তারপর মামিমার পায়ে হাত দিল।

মামা তার কাঁধে হাত রেখে শুধু বললেন,

— "আয়, বাড়ি আয়।"

বহুদিন পর অরিন্দমের সত্যিই মনে হলো—সে বাড়ি ফিরেছে।

বহুদিন পর দুপুরে এমন গভীর ঘুম দিয়েছিল অরিন্দম যে ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বিকেল গড়িয়ে এল।

চোখ খুলেই কিছুক্ষণ বুঝতে পারল না সে কোথায় আছে। তারপর ধীরে ধীরে মনে পড়ল—মামার বাড়ি।

ঘরের বাইরে কোথাও বেশ কয়েকজন মানুষের কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছিল। মন দিয়ে শুনে বুঝল, বাড়ির পাশের বড় আটচালায় আড্ডা বসেছে।

গ্রামের এই জিনিসটা অরিন্দমের সবসময়ই ভালো লাগে।

আড্ডা।

কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নেই, কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব নেই। শুধু মানুষ মানুষকে সময় দিচ্ছে। তার মনে হয়, মানুষের মনের জন্য আড্ডা অনেকটা অক্সিজেনের মতো। শহরের ব্যস্ত জীবনে যেটা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে।

মুখে জল দিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এল সে।

বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ছে। দূরে কোথাও গরু ফিরছে মাঠ থেকে। গ্রামের বাতাসে একটা অলস শান্তি ছড়িয়ে আছে।

পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরাল অরিন্দম।

ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে দূরে তাকিয়ে রইল।

সামনের কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে একটি ছাদে দুজন তরুণ-তরুণীকে দেখা গেল। বয়স খুব বেশি হলে কুড়ি-বাইশ। গভীর মনোযোগ দিয়ে কী একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। মাঝেমধ্যে ছেলেটা হাত নাড়ছে, মেয়েটা হেসে কিছু বলছে।

অরিন্দম অকারণেই মুচকি হাসল।

প্রেম কি না সে জানে না। হয়তো পড়াশোনার কথা, হয়তো ভবিষ্যতের স্বপ্ন, হয়তো একসঙ্গে পথ চলার কোনো অলিখিত পরিকল্পনা।

এই বয়সে মানুষ পৃথিবীটাকে অন্য চোখে দেখে।

অসম্ভবকেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারে।

ভালোবাসার মধ্যেও তখন এক ধরনের সরলতা থাকে। প্রাপ্তির হিসাবের চেয়ে স্বপ্নের অংশটাই বড় হয়ে ওঠে।

অরিন্দম ধোঁয়ার আরেকটা বৃত্ত ছেড়ে আকাশের দিকে তাকাল।

কখন যে নিজের জীবন থেকে সেই বয়সটা নিঃশব্দে পেরিয়ে গেছে, তা আর মনে করতে পারল না।

তবে আজ এত বছর পর সেই তরুণ দুজনকে দেখে তার খারাপ লাগল না।

বরং মনে হলো, পৃথিবী এখনও তার স্বাভাবিক ছন্দেই এগিয়ে চলছে।

নতুন মানুষ আসছে, নতুন স্বপ্ন জন্ম নিচ্ছে, নতুন গল্প শুরু হচ্ছে।

আর হয়তো সেই গল্পগুলোর কিছু একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে, যেমন হয়ে যায় সব গল্পই।

সন্ধের দিকে বৈঠকখানায় বসেছিলেন মামা আর মামিমা। পুরোনো জমিদারবাড়ির সেই বৈঠকখানা এখনও যেন অতীতের অনেক স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। উঁচু ছাদ, মোটা কাঠের কড়িবরগা, দেওয়ালে ঝুলে থাকা পূর্বপুরুষদের বিবর্ণ ছবি আর একপাশে পুরোনো দিনের বিশাল হাতলওয়ালা চেয়ার—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য রয়েছে।

অরিন্দম গিয়ে তাদের পাশেই বসল।

চায়ের কাপ হাতে গল্প শুরু হলো। গ্রামের নানা খবর, পুরোনো পরিচিত মানুষজন, জমিজমার দেখভাল, পুজোর আয়োজন—কত কথাই না উঠল।

কথা বলতে বলতে অরিন্দম মাঝে মাঝেই মামা-মামির মুখের দিকে তাকাচ্ছিল।

বছরখানেক আগে ছেলেকে হারানোর যে দুঃখ, তা মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। সময় তার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে দেয় বটে, কিন্তু মুছে দিতে পারে না। তাদের মুখেও সেই ছাপ স্পষ্ট। তবু মানুষ বাঁচে, জীবন থেমে থাকে না। হয়তো সেই কারণেই তারা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন।

একসময় কথার স্রোত একটু থামতেই মামা বললেন,

— "বাবা, একটা কথা ছিল।"

— "বল।"

— "তোকে তো এই কথা অনেকবার বলেছি। কিন্তু তুই কোনোদিনই কানে তুললি না।"

মামিমা হেসে বললেন,

— "আবার সেই বিষয়?"

— "হ্যাঁ, সেই বিষয়ই।"

মামা অরিন্দমের দিকে তাকালেন।

— "দেখ, ছোটবেলায় বলতিস আগে পড়াশোনা করি। তারপর বললি চাকরি হোক। চাকরি হওয়ার পর বললি একটু গুছিয়ে নিই। তারপর আবার কাজের ব্যস্ততা। দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেল বল তো?"

অরিন্দম শুধু মৃদু হেসে রইল।

মামা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীর গলায় বললেন,

— "তোর মায়ের শেষ সময়টার কথা আজও ভুলতে পারিনি। সব কথা বলতে পারেনি, কিন্তু তার চোখের ভাষা আমি বুঝেছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন বলছে—দাদা, অরিন্দমকে দেখিস।"

বৈঠকখানার পরিবেশ হঠাৎ একটু ভারী হয়ে উঠল।

— "নিজের ছেলে আর তোর মধ্যে কোনোদিন কোনো পার্থক্য করিনি বাবা। আজও করি না। তাই তোর কথা ভেবে মাঝে মাঝে চিন্তা হয়।"

তারপর একটু ইতস্তত করে বললেন,

— "বল তো, তোর কি নিজের পছন্দের কেউ আছে?"

প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

অকারণেই মেঘলার মুখটা মনে পড়ে গেল।

কয়েক ঘণ্টার পরিচয়। অথচ তার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে। কিন্তু সেই ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো অবস্থায় সে নিজেও নেই।

মৃদু গলায় বলল,

— "না, সে রকম কিছু নেই।"

মামা যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন।

— "তাহলে একটা কথা শোন। কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। পুরোনো বনেদি পরিবার। পড়াশোনা জানা, ভদ্র ব্যবহার। কথায় কথায় তাঁর মেয়ের কথাও উঠেছিল।"

মামিমা যোগ করলেন,

— "মেয়েটিও খুব শিক্ষিতা। "

মামা মাথা নেড়ে বললেন,

— "আমরা কিছু ঠিক করিনি। তবে পরিবারটা ভালো লেগেছে। ভাবছিলাম, তোর যদি আপত্তি না থাকে, একদিন পরিচয় করে দেওয়া যেতে পারে।"

অরিন্দম চুপ করে রইল।

বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরে মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। উঠোনে পুরোনো আমগাছের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পরে সে ধীর গলায় বলল,

— "দেখা-সাক্ষাৎ করতে তো ক্ষতি নেই। "

মামার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

— "সেটাই তো চাই। বিয়ে তো একদিনের ব্যাপার নয়, সারা জীবনের।"

মামিমা মুচকি হেসে বললেন,

— "এই প্রথম দেখছি, বিয়ের কথা শুনে তুই উঠে পালাচ্ছিস না।"

কথাটা শুনে তিনজনেই হেসে উঠল।

বৈঠকখানার ভারী পরিবেশটা খানিকটা হালকা হয়ে গেল। তবে অরিন্দম বুঝতে পারছিল, আজকের এই কথোপকথন এখানেই শেষ হয়ে গেলেও তার রেশ হয়তো আরও অনেকদিন থেকে যাবে।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...