Skip to main content

ফিরে দেখা

নবম অধ্যায় : ফিরে দেখা

প্রথম পর্ব : পুরোনো ঠিকানা

শুক্রবার বিকেল।

ব্লক অফিসে কাজের ব্যস্ততা তখন ধীরে ধীরে কমে এসেছে।

অনির্বাণ টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো এক এক করে গুছিয়ে রাখছিল। সোমবার সকালে যেগুলোর কাজ শুরু হবে, সেগুলো আলাদা করে একটি নীল ফোল্ডারে রেখে তার ওপর ছোট্ট করে লিখল— "Priority"

ঠিক তখনই অফিসের পিয়ন এসে বলল,

অনির্বাণবাবু, বিডিও সাহেব ডাকছেন।

অনির্বাণ ফাইলটা বন্ধ করে বিডিওর ঘরে ঢুকল।

আসুন অনির্বাণ। সোমবারের রিপোর্টগুলো সব রেডি তো?

জি স্যার। সব গুছিয়ে রেখেছি। সোমবার দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসব। বাবার চিকিৎসার জন্য কলকাতা যেতে হবে। একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার সময় পেয়েছি।

পরিবার আগে। নিশ্চিন্তে যান। কাজ নিয়ে ভাববেন না।

ধন্যবাদ স্যার।

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অনির্বাণ যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

বাবার অস্ত্রোপচার নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে মনে একটা চাপা দুশ্চিন্তা ছিল।

আজ অন্তত সেই ব্যাপারে এক ধাপ এগোনো যাবে।

অফিস থেকে বেরোতেই বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে।

রাস্তার দু'পাশে দোকানপাট খুলেছে।

চায়ের দোকানে আড্ডা জমতে শুরু করেছে।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে অনির্বাণ স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল।

আজ শুধু ডাক্তার দেখানো নয়।

আজ বহুদিন পর সে ফিরবে সেই ঠিকানায়, যেখানে জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো কেটেছিল।

যেখানে স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু সামর্থ্য ছিল ছোট।

যেখানে ব্যর্থতার সঙ্গে লড়াই করেই একদিন নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিল।

কলকাতার সেই পুরোনো ছাত্রাবাস...

যেখানে এখনও হয়তো কেউ একজন আলো জ্বেলে বসে আছে—একটা চাকরির আশায়।

ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল।

জানালার বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

অনির্বাণের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বহু বছর আগের আরেকটি সন্ধ্যা...

একটা ছোট ব্যাগ।
কয়েকটা বই।
আর বুকভরা একরাশ স্বপ্ন।

আজ সে ফিরছে।

অতিথি হয়ে নয়—

নিজেরই এক পুরোনো ঠিকানায়।

কলকাতার ব্যস্ততা এখনও থামেনি।

বাস, ট্যাক্সি, মেট্রো—সবকিছু যেন নিজস্ব ছন্দে ছুটে চলেছে।

গলির শেষ মাথায় পৌঁছে অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল।

তিনতলা পুরোনো বাড়িটা এখনও আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে।

সময়ের ছাপ পড়েছে দেওয়ালে, কিন্তু লোহার গেটের ওপর নীল রঙের ছোট্ট ফলকটা এখনও স্পষ্ট—

গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

কে?

বারান্দা থেকে নেমে এলেন হরিপদ কাকা।

এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

আরে অনির্বাণ! তুই!

মুহূর্তের মধ্যে ঘরটা যেন উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল।

কেউ এসে জড়িয়ে ধরল, কেউ কাঁধে হাত রাখল, কেউ আবার অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল।

কী রে! একেবারে ভুলেই গিয়েছিলি নাকি?

ব্লক অফিসের চাকরি পেয়ে আমাদের কথা আর মনে পড়ে না?

হাসির রোল উঠল ঘরে।

অনির্বাণও হেসে ফেলল।

এতদিন পরেও যেন কিছুই বদলায়নি।

ঘরের এক কোণে সেই পুরোনো কাঠের আলমারি। জানালার পাশে লম্বা পড়ার টেবিল। বুকশেলফে সাজানো কয়েকটা পুরোনো চাকরির গাইড, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বই আর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা প্রশ্নপত্র।

দেওয়ালে এখনও টাঙানো রয়েছে কয়েকটি বিবর্ণ কাগজ। সময়ের ছাপ পড়েছে, তবু অক্ষরগুলো স্পষ্ট।

“স্বপ্ন সেটা নয়, যা ঘুমিয়ে দেখা যায়;
স্বপ্ন সেটাই, যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।”


“সময়কে সম্মান করো,
সময়ই একদিন তোমাকে সম্মান দেবে।”


“আজকের ত্যাগই আগামী দিনের পরিচয়।”

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

কত রাত যে ওই কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজেকে আবার নতুন করে পড়তে বসিয়েছে, তার হিসেব নেই।

অনির্বাণ চারদিকে তাকাল।

নতুন কয়েকটি মুখ এসেছে, কয়েকটি পুরোনো মুখ আর নেই।

তবু ঘরটার বাতাসে এখনও সেই একই গন্ধ—সংগ্রামের, বন্ধুত্বের আর অদম্য স্বপ্নের।

⚽ গোওওল...!

টেলিভিশনে তখন খেলার উত্তেজনা তুঙ্গে।

দেবু থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি চিৎকার করত। আর্জেন্টিনা নিয়ে ওর পাগলামির শেষ ছিল না।

অনির্বাণ চারদিকে তাকিয়ে বলল—

দেবু কোথায়? ওকে তো দেখছি না।

ঘরের ভেতরটা হঠাৎ একটু চুপ হয়ে গেল।

ও আর এখানে থাকে না। এখন একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করে।

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল—

কৃষ্ণা... কেমন আছে?

ঘরের ভেতরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রশ্নটার উত্তর আসার আগেই অনির্বাণের চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো এক বিকেল...

কলেজ স্ট্রিটের ছোট্ট এক চায়ের দোকান।

লাজুক মুখে দেবু বলেছিল—

এই হচ্ছে কৃষ্ণা।

তারপর কতদিন, কত সন্ধ্যা, কত রাত—কৃষ্ণাকে নিয়েই গল্প করেছে দেবু।

ভবিষ্যতের ছোট্ট সংসার, দু'কামরার একটা বাড়ি, জানালার ধারে কৃষ্ণার পছন্দের গাছ...

সবই যেন তার চোখের সামনে তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

মেসের ছোট্ট ঘরে দেবুর পড়ার টেবিলের সামনে একটা সাদা কাগজ সাঁটা ছিল।

"কৃষ্ণার জন্য আমাকে একটা সরকারি চাকরি পেতেই হবে।"

ক্লান্ত লাগলেই দেবু ওই লেখাটার দিকে একবার তাকাত।

তারপর আবার বই খুলে বসত।

রাত জেগে পড়ত।

প্রশ্নপত্র সমাধান করত।

কৃষ্ণা শুধু তার ভালোবাসার মানুষ ছিল না, ছিল তার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

চাকরি পাওয়ার স্বপ্নটা ছিল নিজের জন্য যতটা, তার চেয়েও বেশি ছিল কৃষ্ণার জন্য।

কিন্তু সময় সবসময় মানুষের পরিশ্রমের সমান ফল দেয় না।

একের পর এক পরীক্ষা দিয়েও সরকারি চাকরিটা আর পাওয়া হলো না।

অপেক্ষা দীর্ঘ হতে লাগল।

তখনই দেবু একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখার আশায় সে একটি ভালো বেতনের বেসরকারি কোম্পানিতে যোগ দিল।

নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস করেছিল, কিন্তু কৃষ্ণার হাতটা ছাড়তে চায়নি।

ভেবেছিল, চাকরিটা পেলেই হয়তো কাকু রাজি হয়ে যাবেন। সরকারি না হোক, নিজের পায়ে তো দাঁড়িয়েছে...

কিন্তু...

সেটুকুও যথেষ্ট হলো না।

কৃষ্ণার বাবা বলেছিলেন, "আমার মেয়েকে সরকারি চাকরিজীবী ছেলের হাতেই বিয়ে দেব।"

তাঁর বিশ্বাস ছিল, সরকারি চাকরিই মেয়ের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

দেবুর বেসরকারি চাকরি, ভালো বেতন, দায়িত্ববোধ—কোনোটাই সেই বিশ্বাস বদলাতে পারেনি।

হয়তো একজন বাবার দৃষ্টিতে সেটাই ছিল মেয়ের নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

কিন্তু সেই হিসাবের বাইরে থেকে গিয়েছিল দুটি মানুষের ভালোবাসা।

অপেক্ষা করতে করতে একদিন খবর এল...

কৃষ্ণার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

তারপর একদিন কৃষ্ণা অন্য এক সংসারের মানুষ হয়ে গেল।

ঘরের ভেতরটা যেন আরও নীরব হয়ে উঠল।

টেলিভিশনে খেলা চলছিল, কিন্তু কারও মন আর সেখানে ছিল না।

রাহুল ধীরে ধীরে বলল—

দেবু অনেকদিন ভেঙে পড়েছিল।

তারপর একদিন নিজেকেই বলেছিল, জীবন তো আর থেমে থাকবে না।

এখন ও নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। নিজের মতো করে বাঁচতে শিখে গেছে।

একটু থেমে রাহুল আবার বলল—

মানিয়ে নিয়েছে। আসলে মানুষকে মানিয়ে নিতেই হয়।

যে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই-ই টিকে থাকে।

সংসারও তো এমন করেই এগিয়ে যায়।

অনির্বাণ জানালার বাইরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

বাইরে কলকাতার রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছে।

ঘরের ভেতরে বন্ধুরা আছে, টেলিভিশনে বিশ্বকাপের ফাইনাল চলছে, তবু প্রত্যেকেই যেন নিজের নিজের জীবনের অঙ্ক কষছে।

অনেকক্ষণ পরে অনির্বাণ ধীরে বলল—

মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনটা বোধহয় এমনই।

অনেক সময় ভালোবাসার চেয়ে হিসাব বড় হয়ে যায়। নিরাপত্তার হিসাব, ভবিষ্যতের হিসাব, সমাজের হিসাব...

সেই হিসাব করতে গিয়েই কখনও কখনও মানুষের মনের সুখটা কোথায় হারিয়ে যায়, সেটা আর কেউ খেয়াল করে না।

কেউ কোনো কথা বলল না।

অনির্বাণ আবার ধীরে বলল—

সরকারি চাকরি অবশ্যই সম্মানের। একজন বাবা তাঁর মেয়ের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাইবেন, সেটাও খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু শুধু সরকারি চাকরি পেলেই যে মানুষ সুখী হবে, তার নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?

সুখেরও তো কোনো নিয়োগপত্র হয় না।

ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

অনির্বাণ মৃদু হেসে আবার বলল—

দেবু কী-ই বা করতে পারত?

সবাই তো দেবদাস হয়ে বাঁচে না। আর হওয়াও উচিত নয়।

জীবন থেমে থাকে না। মানুষকে একদিন না একদিন উঠে দাঁড়াতেই হয়।

মানাতে মানাতে, মানিয়ে নিতে নিতেই হয়তো মধ্যবিত্ত মানুষের একটা জীবন কেটে যায়।

ঠিক তখনই টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠলেন—

⚽ গোওওওল...!

মুহূর্তের মধ্যে আবার ঘরটা হাততালি, শিস আর উল্লাসে ভরে উঠল।

কেউ লাফিয়ে উঠল, কেউ বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল, কেউ আবার আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

কিছুক্ষণ আগের নীরবতা যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

অনির্বাণও পর্দার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।

তার মনে হলো—

জীবনও যেন ফুটবল ম্যাচের মতো।

কেউ জেতে,
কেউ হারে।

কেউ স্বপ্ন পূরণ করে,
কেউ স্বপ্নকে স্মৃতি বানিয়ে এগিয়ে যায়।

তবু খেলা যেমন থেমে থাকে না,
জীবনও কারও জন্য থেমে থাকে না।

Comments

Popular posts from this blog